Tuesday, July 18, 2023

৭ই মার্চের ভাষন ও বংগবন্ধুকে ছূয়ে দেখার টুকরো গল্প-কথা।

 

 

৭ই মার্চের ভাষন ও বংগবন্ধুকে ছূয়ে দেখার টুকরো গল্প-কথা (গল্প নয় সত্যি)।

 
আমার জীবনের স্মরণীয় কিছু গল্পগুচ্ছ আকারে উপস্থাপন করব বলে মনে করি, কিন্তু সময় হয়ে উঠেনা। অনেক সময় দেখা যায়, সেই স্মৃতিকথা মনে করলে খুব কষ্ট লাগে আবার কখনো খুব ভালো লাগে। মনে হয়, যদি আবার সেই সময় গুলো ফিরে আসতো আমার জীবনে বা আমি ফিরে যেতে পারতাম আবার জীবন অতীতে।
 
১৯৭১ সন। আমার বয়স সেই সময়ে ৯/১০ বছর হবে, তখন একদিন দেখি সবাই রেসকোর্স ময়দানে যাবে বড় ছোট অনেকেই মানুষ যাচ্ছে কিন্তু রেসকোর্স তো আমি চিনি না আমারও যেতে ইচ্ছা করে। সেখানে কি হবে ? সেখানে শেখ মুজিবর রহমান ভাষণ দিবেন বাংগালী জাতির মুক্তির জন্য। তারিখ ছিল ৭ই মার্চ ১৯৭১ সাল । আমার শ্রদ্ধেয় বাবা মরহুম শেখ মো: মোবারক আলী তখন ইস্ট পাকিস্তান পোষ্টাল ডিপার্টমেন্টে সুপারিনটেন্ডেন্ট পদে চাকুরী করতেন। সেই সুবাদে তিনি ইস্ট পাকিস্তান পোষ্টাল ইউনিয়নের নির্বাচিত জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন। তখন সরকারী অফিস টাইম ছিল সকাল ৭.০০ থেকে দুপুর ২.০০ টা পর্যন্ত। আমি হঠাৎ একদিন দেখলাম দুপুরের পর আমার বাবা পাঞ্জাবী-পায়জামা পড়ে রওনা দিয়েছেন কোথাও যাচ্ছেন।আমার মনে হলো, তিনিও হয়তো রেসকোর্স ময়দানে যাবেন। 
 
তখন খিলগাঁও তিলপাপাড়া দিয়ে খিলগাও রেলগেইট থেকে কোন রাস্তা ছিল না, আমরা গুলিস্তান বা মতিঝিল বা সদরঘাট অন্যান্য দিকে যেতে হলে, পায়ে হেটে বাসাবো রেল ক্রসিং(বর্তমানে এর অস্তিত্ত নেই, বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তদস্থলে একটি ফুট ওভার ব্রিজ করা হয়েছে) পার হয়ে শাহজাহানপুর এর ভিতর দিয়ে কলোনির মধ্য পথ দিয়ে মতিঝিল সেন্ট্রাল গভমেন্ট হাইস্কুলের সামনে এসে বড় রাস্তায় মূল যাত্রা করতে হতো। তারপর তিলপাপাড়া থেকে আরেকটা রাস্তা ছিল সেটা হল, খিলগাঁও ৮০ ফুট রাস্তা দিয়ে পশ্চিম দিকে শাজাহানপুর রেলগেট নামে ছোট লেভেল ক্রসিং পার হয়ে রেললাইন ঘেঁষে (এখন খিলগাঁও বাজারে ভিতরে পড়েছে রাস্তাটা)রাস্তা ধরে গিয়ে ইনকাম ট্যাক্স কলোনি হয়ে মতিঝিল সেন্ট্রাল গভমেন্ট হাইস্কুলের সামনে এসে ডানে/বামে বড় রাস্তা দিয়ে বড় গাড়ি চলাচল করতো, বড় গাড়ি বাস মানে কাঠবডি মুড়ির টিন। তখন এই রাস্তা দিয়ে লোকাল বাসে (মুড়ির টিনে) করে আমরা সবাই রামপুরা থেকে খিলগাঁও হয়ে সদরঘাট যাতায়াত করতাম। তো পায়ে হেঁটে যোগাযোগের জন্য বাসাবো রেল ক্রসিং পার হয়ে আমরা চলে যেতাম ঐ পথ ধরে মতিঝিল রাজপথে। 
 
গল্পে ফিরি, আমার বাবা যাচ্ছেন, অন্যান্য লোকদের সাথে মিলে আমি বাবাকে ফলো করতে থাকলাম, মতিঝিল সেন্ট্রাল গভমেন্ট হাইস্কুলের ডানদিকে মির্জা আব্বাসের বাড়ির সামনে থেকে সোজা পশ্চিম দিকে রাজারবাগের রাজপথ ধরে হাঁটতে থাকলাম। শত শত মানুষ রাস্তায় পায়ে হেঁটে চলেছে রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে । তখন শাহজাহানপুর ভিতর দিয়ে রোডটা ছিল না, বাবাকে ফলো করে আমি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে ফকিরাপুল বাজারের ভিতর দিয়ে সোজা মতিঝিল ১৬তলা বিল্ডিং বরাবর মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার বড় রাস্তায় উঠে গেলাম। সেখান থেকে একটু ডানে গেলেই দৈনিক পাকিস্তান খবরের কাগজের অফিস (যেটা বর্তমানে দৈনিক বাংলার মোড় বলে) আমি বড় রাস্তায় উঠে হাজার হাজার মানুষ দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। আমি পিছন থেকে ‘বাবা, বাবা, আমি যাব, আমি যাব’ এ কথা বলে চিৎকার করতে থাকি হঠাৎ আমার বাবা পিছন দিকে তাকিয়ে দেখে আমি তাকে ফলো করছি। তখন বাবা অবাক হয়ে গেল কিরে তুই আমার সাথে আসতেছিস কেন ? তা আমি বললাম, আমি ভাষণ শুনতে যাব, তখন দুপুর আড়াইটা হয়ে গেছে পিজ ঢালা পথ গরম তাপ ছড়াচ্ছে। কোন গাড়ি নেই হরতাল/বন্ধের ডাক দেয়া হয়েছে তাই। বাবার সাথে আমি হাটছি, পিস ঢালা পথ গরম হয়ে গেছে, আমার পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল ছিল। নিরুপায় হয়ে বাবা আমাকে হাত ধরে সামনে নিয়ে চললেন। আমার মনে পড়ল, প্রেসক্লাবের সামনে আমরা আসি, তারপর বিজয়নগর পার হয়ে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের ডান পাশ দিয়ে হাইকোর্টের সামনে গেলাম। তখন বাবা আমার হাত জোড় করে শক্তভাবে ধরে রেখেছেন, যেন আমি ছুটে না যাই। আমি চারিদিক দেখছিলাম আর রোমান্চিত হচ্ছিলাম। তারপর যেতে যেতে রমনা পার্কের কাছে এলাম যেটা রমনা পার্ক বাম পাশে হাইকোর্টের সামনের বড় পথ ধরে আমরা সামনের দিকে চললাম। 
 
ঘোড়া দৌড়ের রেসকোর্স ময়দান ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এর পাশে অবস্থিত ছিল। একটু সামনে গিয়ে দিয়ে বড় কাঠের বেড়ার নিচ দিয়ে ফাঁক গলিয়ে আমরা অন্যান্য মানুষের সাথে আমরাও ঢুকে পরলাম মাঠের মধ্যে। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসেছে, আমরা লক্ষ মানুষের কাছে গিয়ে বসলাম। খোলা ঘাসের মাঠ, বসা তো নয় মানে অনেকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবাই ভাষণ শুনতে ছিলাম (ইতিমধ্যে ভাষণ শুরু হয়ে গিয়েছে)। অনেকক্ষণ আমি আকাশের দিকে থাকলাম, বিদেশীরা হেলিকপ্টার দিয়ে ভিডিও করতেছে, জনগণের উপর চক্কর দিতেছে। জীবনে প্রথম কাছে থেকে উড়ন্ত হেলিকপ্টার দেখলাম। আমার বাবার পাশে একজন ভদ্রলোক ছিলেন, দেখতে সুন্দর, অনেক হ্যান্ডসাম লম্বা ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, বাবু তুমি তোমার আব্বুর সাথে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে এসেছ ? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বরলেন, তোমার তো অনেক সাহস ! আমি বললাম, ওই যে মাইকের মধ্যে বক্তৃতা দিতেছে আমি ওই মানুষটারেকে দেখবf, উনি কোথায় তখন কথা বলেন ? ঐ ভদ্রলোক আমাকে উচু করে উপড়ে তুলে ধরে তার ঘাড়ের উপরে বসালেন এবং বললেন, ওই যে দূরে ডান দিকে মঞ্চের উপর সাদা পাঞ্জাবীর উপড় কালো কোট পড়া, একজন হাত উঁচু করে জোরে জোরে বক্তৃতা করতেছেন উনি শেখ মুজিবুর রহমান, উনি আমাদের নেতা, উনি পাকিস্তানী সরকারের বিরুদ্ধে আমাদেরকে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন । তখন প্রায় বিকাল গড়িয়ে গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান বরলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিব, এদশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।“ আমি অবাক হয়ে গেলাম, বক্তৃতা শুনে মন শিহরিত হলো। তাহলে আমরা পারধীন আছি ? আমার মনের মধ্যে একটা বাসনা জাগলো, এই লোকটাকে যদি আমি সামনে থেকে দেখতে পারতাম। এরই মধ্যে কখন জানি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। বক্তৃতা শেষ হয়ে গেলে সবাই বাইরের দিকে ছুট তে লাগলো। বাবা আমাকে জোর করে হাতে ধরে রাখলেন, যাতে করে আমি হারিয়ে না যাই। তারপর আমি যেহেতু ছোট ছিলাম বড় বড় মানুষের ভীরে আমি আশেপাশে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না শুধু আকাশ দেখছিলাম। বাবার ধরা হাতে পিছু পিছু দ্রুত বাবার সাথে হেঁটে চলছি, বাবা আমাকে ধরে রেখেছেন তারপর আমার আর কিছু মনে নাই হাঁটতে হাঁটতে আমরা কোন দিক দিয়ে যে আবার খিলগাঁর বাড়ীতে এসেছি আমার সেটা মনে করতে পারছি না । আমার মনে হয়, রাত হয়ে গিয়েছিল, এক সময় দেখলাম আমি বাবার সাথে বাসায় গেটের সামনে চলে এসেছি। চারিদিক অন্ধকার নেমে আসছে। তখন আমাদের এলাকায় ইলেকট্রিসিটি লাইন বসেনি তাই রাস্তায় তেমন আলো ছিল না। 
 
তারপর স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ। আমরা আমাদের খিলগাঁয়ের বাড়ীতে ছিলাম প্রায় সারা যুদ্ধের বছর। তারপর দেশ স্বাধীন হলো, ১৯৭২ সালে স্কুলে আমাদের সবাইকে অটো-প্রমোশন দেয়া হলো, ক্লাশ এইটে উঠলাম। বংগবন্ধূ শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে বাংলাদেশে চলে এলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের হাল ধরলেন, শাসনভার গ্রহণ করলেন। রেডিওতে প্রতিদনি বংগবন্ধূর ভাষনের খন্ড বক্তৃতাংশ প্রচার করা হতো। 
 
এর মধ্যে আমি স্কুলে ১৯৭৪ সালে নিউ টেন ক্লাসে উঠলাম। তখন সারাদেশে বন্যা, ঢাকা শহর ডুবে গিয়েছিল কোন লেখাপড়া ছিল না। আমাদের রেশন কার্ড দিয়ে চাল, গম, চিনি উঠানো, এটিই আমার ডিউটি ছিল। তখন খিলগাও এ নৌকা করে এদিক সেদিক যেতে হতো । 
 
হঠাৎ একদিন শুনি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের খিলগাও এ স্কুল ভিজিটে ত্রান কার্যক্রম দেখতে আসবেন। আমাদের স্কুলের আগের হেডমাস্টার ছিলেন মিসির আলি স্যার।তিনি পরবর্তীতে এই এলাকার আমাদের এলাকার সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি খিলগাও মডেল কলেজ স্থাপন করেন।বঙ্গবন্ধু তাকে খুব ভালবাসতেন, তার অনুরোধে খিলগাও মডেল হাইস্কুলে বঙ্গবন্ধু আসবেন। যেই শুনা, সেই কাজ। আমি আগেই বিষয়টি লোক মুখে বিষয়টি জনেছিলাম। আমাদের তিলপাপাড়তে এখন যে ‘ঢাকা হোটেল’ হয়েছে, এর পাশে জোরপুকুর নামে একটা পুকুর ছিল, সে পুকুরের ডান পাশে একটি রেসের ঘোড়া পালতো, আমি ওই বাড়ির পাশ দিয়ে কোমর সমান পানি ভেঙে ৮০ ফুট রাস্তা দিয়ে আমি খিলগাও মডেল স্কুলের মেইনগেট দিয়ে ভিতরে ঢুকি। অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু আসবে বলে, তো আমি গেটের সামনে দু’ধারে দাঁড়ানোর জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গেইট দিয়ে ঢুকছেন, তখন দেখলাম পাশে আমাদের মিসির আলি স্যার আছেন। দুই পাশে দুইটা পুলিশ ছিল, বঙ্গবন্ধু পায়ে হেঁটে হাটুর উপর পর্যন্ত তার পানি ছিল সেভাবে তিনি স্কুলে ঢুকেছিলেন। আমি হঠাৎ দৌড়ে পানি ভেংগে তার সামনে গিয়ে আমার দুই হাতে তার ডান হাত ধরে হ্যান্ডশেক করি আর বঙ্গবন্ধুকে বলি, আমি আমার আব্বার সাথে গিয়ে আপনার ৭ই মার্চের ভাষণ রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে শুনেছি । তখন বঙ্গবন্ধু আমার মাথায় চুলের মধ্যে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি আমাকে এতো ভালোবাসো, এতো পানির মধ্যে আমাকে দেখতে এসেছ? তখন পুলিশ এসে আমাকে বলল, যাও তুমি পাশে গিয়ে দাঁড়াও (আমার সাথে কেউ কোন খারাপ ব্যবহার করেনি)। বিষয়টা তখন আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। তো বঙ্গবন্ধুর সাথে হ্যান্ডশেক করার সময় আমার মনে হল, “তার হাতটা বিশাল বড়, আমি ছোট মানুষ দুই হাত দিয়ে তার সাথে হ্যান্ডশেক করেছি আর তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন” এই স্মৃতিটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় ঘটনা বলে আমি মনে করি। 
 
এতদিন পর ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে যখন আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো তার সাথে সাথে ইন্টারনেটের যুগ চলে আসলো। সবাই ফেসবুক, লিংকেডইন, ব্লগার সাইট, আরো অনেক ধরনের ডিজিটাল ব্যবহার করতে শুরু করলো, আমিও ফেসবুকে আমার আইডি খুললাম, তো দেখলাম ৭ই মার্চের ভাষণে আমরা তখন টেলিভিশনে সাদা কালো বক্তৃতা দেখেছিলাম।বর্তমানে তো দেখলাম, সাদাকালো ভিডিও এটা রঙিন করা হয়েছে। সেই ভিডিওটা আপলোড করা হয়েছে, আমি স্মৃতি কাতর হয়ে সেই ফেলে আসা বাবার সাথে রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চের বক্তৃতা শোনার বিষয়টা বারবার আমার মনে উদিত হতে লাগলো। সেই অনুপ্রেরণা থেকে আমি ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলাম তো ভাবলাম সে পোস্টটা খুব ছোট ছিল। এখন এতদিন পরে আমার মনে হলো, আমার জীবনে গল্প রয়েছে, আমার বন্ধুরা, সহপাঠীরা বা ফেসবুকের ফলোয়াররা আমার এই ঘটনাটা কিভাবে নেবে জানিনা। তবে আমার বাবা যেহেতু রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি ইস্ট পাকিস্তান পোস্টাল ইউনিয়ন এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। বাবার মুখে শূনতাম- বঙ্গবন্ধুর সাথে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল, যোগাযোগ ছিল । তো সেই সুবাদে উনি প্রায়ই ৩২ নম্বর ধানমন্ডি বাড়িতে যাতায়াত করতেন। তো আমি এতদিন পরে মনে করি, আমি ইতিহাসের ছোট একটি অংশের সাক্ষী, সেরা মানব যারা পৃথিবীতে এখন বেঁচে নেই কিন্তু অমর হয়ে আছেন। এবং তারা দেশব্যাপী সমাদৃত ইতিহাসের অংশ, আমি সেই ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম কাছে থেকে, হাত দিয়ে স্পর্শ করে। আজ অনেকেই নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক পরিচয় দিয়ে নিজেদের জাহির করেন।আমার বয়সী অনেকে আছেন, তারা কি কখনো বঙ্গবন্ধুকে স্বচক্ষে দেখেছিলেন? হয়তো না কিন্তু অনেককেই এমনভাবে রাজনীতিতে বক্তৃতা করতে দেখি যে, মনে হয় তারা বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে ছূয়ে দেখেছিলেন আমার মতন । সারা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে হয়তো কয়েকজন সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সাথে থেকে ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছিল। আমার জীবনে কোন এক সময় ঢাকা শহরে বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম। সেই সুবাদে আমি মনে করি, আমি একটি ইতিহাসের অলিখিত অজানা ছোট একটা অংশ। খুব ভালো লাগে, এ বিষয়গুলো যখন আমি স্মৃতিচারণ করি। ভাবতে এত ভালো লাগে যে, সত্যি আমি যদি তখন রাজনীতিতে জড়িত হতাম আমি অনেক বড় পদে আজ অধিষ্ঠিত থাকতাম, যেহেতু আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমার কর্ম জীবন শেষ করেছি তাই রাজনীতি করার সুযোগ আমার আর হয়নি। তবে আমি বাংলাদেশকে ভালবাসি, ছূয়ে দেখা বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসি। যেহেতু তাকে আমি ছুঁয়ে দেখেছি, বঙ্গবন্ধু বাস্তবে কি ছিলেন যারা কোনদিন বঙ্গবন্ধুকে দেখেননি, ছুঁয়ে দেখা তো দূরের কথা। তারা লোকমুখে শুনে বা পারিবারিক মত অনুসরন করে দল করেন, তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে অনেক কথা বলেন কিন্তু নিজেরা সে আদর্শ কোনদিনও নিজেদেরকে জীবনপথে চালিত করতে পারেন না। আমার মনে হয়, যেটা অনেকটা অতিরিক্ত অতিরঞ্জিত লোক দেখানো আবেগ প্রকাশের নামান্তর মাত্র। 
 
আমার মনে হল, আমার জীবনের এই গুচ্ছগল্পের ঘটনাটি লিখে যাই, এই ছোট গল্পটি আমার পরবর্তী প্রজন্ম যাতে পড়ে জানতে পারে আমরা স্বাধীনতার একটা যুদ্ধের অংশ ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার পরিবার তথা বাবা নিজ পেশায় থেকে রাজনীতিতে সমর্থন যুগিয়েছেন। বাবার মুখে শুনেছি, পাকিস্তান তথা পরবর্তীতে বাংলাদেশ আমলে বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন চার নেতার একজন জনাব কামরুজ্জামান। সত্যি আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি, রাজনীতি না করেও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের আমি একটা ছোট অংশ হতে পেরেছি। এতাদিন পর মনে হয়, উপরের ঘটনাটি আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল, যা আমার স্মৃতির ভান্ডারকে রোমাঞ্চকর করেছে বলে আমি করি। 
 
লেখক: এস,এম, নজরুল ইসলাম।
তারিখ: ১৯-০৭-২০২৩খ্রি:।
(প্রথম ভয়েস টাইপিংয়ে লেখা)

Monday, November 7, 2022

স্মৃতির পাতায় ঢাকাতে ১৯৮৮ সনের ভয়াবহ বন্যার দিনগুলি ।

 

 No photo description available. May be an image of lake No photo description available. May be an image of lake

স্মৃতির পাতায় ঢাকাতে ১৯৮৮ সনের ভয়াবহ বন্যার দিনগুলি 

লেখক: এস, এম, নজরুল ইসলাম 
 

উপরের সংগৃহীত ছবিগুলি ১৯৮৮ সনের দেশব্যাপী বন্যার সময়কালের খিলগাও তালতলা মার্কেট, গোড়ান বাজার, বাসাবো, খিলগাও সি-ব্লক এলাকা থেকে তোলা হয়েছে। 

ছবিগুলি বন্যার সময়কার আমার স্মৃতির পাতা্র অতীত বাস্তবতা। তখন আমার নিজ পরিবারের সকল সদস্যরা ঢাকার মিরপুর-১০ এ বসবাস করতো। আমি ঐ সময় একা খিলগাও এ অবস্থান করছিলাম। ১৯৮৮ সনের বন্যার সময় খিলগাও এলাকার প্রতিটি পাকা রাস্তায় গাড়ীর ইন্জিন পানিতে ডুবে যেত বলে কোন গাড়ি চলাচল করতো না। ঐ সময় খিলগাও রেইলগেটের পুর্ব (তিলপাপাড়া রোড) ও উত্তর (৮০ ফুট রোড) দিকের ঢালু পাকা রাস্তাতে ২টি অস্থায়ী নৌকা ঘাট হয়েছিল। নৌকা চালকরা ডেকে ডেকে নৌকায় বিভিন্ন গন্তব্যের পেসেন্জার তুলতো।

খিলগাও, তিলপাপাড়া ৭নং রোডে অবস্থিত আমাদের নিজেদের বাড়ী ২২৩নং এ ও বড় বোনের ২১৫ নং টিনশেড বাসার ভিতরে কোমর সমান পানি উঠেছিল। ফলে সকল ভাড়াটিয়ারা নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে খিলগাও রেইলগেট থেকে আমি আমাদের বাসা দেখতে যেতাম। কোষা নৌকায় যাওয়া ও খিলগাও রেইলগেট ফিরতি আসা ৫+৫ টাকা। নৌকা থেকে বাড়ী দেখতাম, বাড়ীর ভিতর ঢোকা সম্ভব হতো না। কখনো আবার ২/৩ জন মিলে পাকা রাস্তায় কোমড় সমান পানি ভেংগে আমাদের ও বড় বোনের বাড়ীর ভিতরে দেখে আসতাম। 

তখন কম্পিউটার ট্রেনিং ক্লাশ করার জন্য খিলগাও রেইলগেট থেকে মতিঝিল বিআইডব্লিওটিসি ভবনে বন্ধু মতিনুর রহমানের অফিসে যেতাম ঠেলাগাড়ীতে জনপ্রতি ভাড়া ১০ টাকা করে। শাহজাহানপুর-রাজারবাগ মোড় থেকে সমগ্র মতিঝিল পানিতে ডুবে গিয়েছিল। তাই বন্যার সময় আমারা সবাই এমন ভাবেই শহরের ভিতরে যাতায়াতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। 

বিগত ১৯৮৮ সনের বন্যার সময় আমি খিলগাও রেইলগেট সংলগ্ন একটি ভবনে এক পরিচিত জনের বাসায় ও ঘনিষ্টজন ডা: আব্দুুর রব ভাইয়ের ঔষধের দোকানে ১৫ দিনের মতো শেয়ারিং করে রাত যাপন করেছি আর খাবার খেয়েছি হোটেলে।  সেই ১৯৮৮ সনের বন্যার সময় ডা: আব্দুুর রব ভাইয়ের এক মেয়ের জন্ম হয়েছিল, তাই তার নাম রাখা হয়েছিল নাসরিন জাহান ওরফে 'বন্যা'। 

চারিদিকে পানি আর পানি, কোথাও বেড়ানোর জায়গা ছিল না তাই প্রতিদিন বিকেল বেলা রেইলগেট সংলগ্ন দোতলায় হোমিও ঔষধের দোকান 'শারমিন হোমিও হল' এর সামনে বসে মানুষের কোলাহল ও নৌকায় যাতায়াত দেখতাম। 

এই ১৯৮৮-র বন্যা ছিলো বাংলাদেশে সংঘটিত প্রলংকারী বন্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে সংঘটিত এই বন্যায় দেশের প্রায় ৬০% এলাকা ডুবে যায় এবং স্থানভেদে এই বন্যাটি ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। এটি ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষয়-ক্ষতিময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সেই বন্যার দিনগুলিতে ভাসমানভাবে বসবাসকারী সকলের সাথে আমার ফেলে আসা খুব মনে পড়ে।

ঐ বন্যার সময়টা ছিল আমার জীবন ঘনিষ্ঠ স্মৃতিময় এক রোমান্চকর কাহিনী।

 

Saturday, November 5, 2022

"শিকল বন্দি বানর জীবন" VS "রিমোট কন্ট্রোল রোবট" ।

 


এস,এম, নজরুল ইসলামের জীবন ঘনিষ্ট টুকরো গল্প-কথা (০২)

May be an image of 3 people, animal and outdoors  May be an image of 2 people

"শিকল বন্দি বানর জীবন" VS "রিমোট কন্ট্রোল রোবট" 

লেখক: এস, এম, নজরুল ইসলাম। প্রকাশের তারিখ: ০৭-১১-২০২২ খ্রি:।

আপনারা নিশ্চয় দেশের বিভিন্ন হাট-বাজার-মহল্লায়, খোলা জায়গায় প্রশিক্ষিত বানর দিয়ে পাবলিকদের খেলা দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করতে দেখেছেন।আমি তাদের নিয়ে একটু আলোচনা করবো।
 
আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, ঐ সকল বানরের মালিক যে সকল বন্য বানর দিয়ে খেলা দেখায় সেগুলিকে প্রকৃতির বানর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিশুকাল থেকে পোষ মানিয়ে ট্রেইন্ড-আপ করানো হয়। বন্য বানর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই বানরগুলির মগজে মানুষ্য সমাজে সহবসবাসের মেন্টালিটি তৈরী করা হয়। আর অর্থ আদায়ের জন্য সময়ে সময়ে ট্রেনিংয়ের নামে অত্যাচার করে শিক্ষাতে রপ্ত করা হয়। পরবর্তীতে মানুষ নিজেদের স্বার্থে পোষা বানরগুলি দিয়ে লোকালয়ের বিভিন্ন স্থানে খেলা দেখোনোর সময়, বানরগুলিকে সময়ে সময়ে কিছু মৌখিক, হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে আঘাত করে বা শব্দভিত্তিক নির্দেশনা দেয়া হয় এবং বানরগুলি তা খেয়াল করে তার মালিকের ট্রেনিং মতে নির্দেশগুলি প্রতিপালন করে উপস্থিত দর্শকদের মনোরন্জন করে থাকে। পরবর্তীতে বানরের মালিক নিজে ভিক্ষা না করে ঐ বানরগুলিকে দিয়ে দর্শকদের কাছে হাত পেতে বকশিশ/টাকা বা ভিক্ষা চাওয়ার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। মালিকের নির্দেশ না মানলে পরবর্তিতে হয়তো তাদেরকে অনাহারে থাকতে হতে পারে বা অত্যাচারের শিকার হতে পারে। তাই ভয়ে সব নির্দেশ প্রতিপালন করা ছাড়া উপায় থাকে না।
 
আপনি জ্ঞানী হলে একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন যে, এখানেই টোটাল পারফরমেন্সের জন্য বানরের কোন ক্রেডিট নেই, সকল ক্রেডিটই প্রাপ্য ঐ বানরের দড়ি/শেকল হাতে ধরা লোকটির যে পিছন থেকে সকল কল-কাঠি নাড়ছে আর বানরগুলিকে কন্ট্রোল করছে। কারন শিশুকাল থেকে বানরগুলিকে এমনভাবে শিক্ষা দেয়া হয় যে বানরগুলি মালিকের কথার অবাধ্য হতে সাহস করে না কখনো।আর সে যে একটি বানর প্রজাতির চতুর প্রানি এটাও সে ভুলে যেতে বাধ্য হয় কারন শাস্তির ভয়, খাবার প্রদান কন্ট্রোল, যেখানে সেখানে মুক্তভাবে অবাধ চলাচল করার বিষয়টি বানরের কল্পনারও বাইরের থাকে! বানর মনে করে সে ছুটে পালাতে চাইলেও মালিক তাকে ধরে ফেলবে আর মারধর করবে শাস্তি দিবে তাই সে পালাতেও সাহস সন্চয় করতে পারে না।
 
মনেবিজ্ঞানের ভাষায়, দীর্ঘদিন যাবত নিজস্ব স্বভাব বিরোধী লাইফ প্র্যাকটিসের ফলে এই সকল প্রানিগুলির মুক্ত বিবেক, বুদ্ধি অনেকটা লোপ পায়। পৃথিবীতে যে একটা মুক্ত বানর সমাজ আছে তা বানরগুলিকে শিশুকাল থেকেই ভুলিয়ে দেয়া হয়। তাই চেষ্টা করলেও বন্দি বানরগুলি কোনদিনও আর ফিরে যেতে পারে না স্বাভাবিক জংগল জীবনে অথবা তাদের মুক্ত বানর সমাজে। এই বানরগুলি হতাশায় দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, কোনক্রমে ফিরে যেতে পারলেও হয়তো তাদেরকে আর তাদের বানর সমাজে সহজভাবে গ্রহন নাও করতে পারে। তাছাড়া মুক্তভাবে বাঁচতে গেলে যে শক্তি, বুদ্ধি, সামজিক জ্ঞান, শক্তি ও সাহস দরকার, বয়সের তুলনায় সেগুলি তাদের মধ্যে অভাব থাকে। বানরটি বিজাতীয় মানুষ সমাজে নিজস্ব বন্চিত সমাজ ব্যবস্থাহীন পরিবেশে বেড়ে উঠায় তার দেহে ও মনে তৈরী হয়ে উঠে না নিজ জাতীয় স্বাধীন স্বত্তার।
 
বর্তমানে একই রকম ঘটনারই যে পূনরাবৃতির ঘটছে আমাদের সমাজের বহু সংসারে তা অনেক বাবারা বুঝেও বুঝে না যে, নিজ স্ত্রী তথা মায়ের কারনে তাদের সন্তানগুলি শিকল বন্দি বানর জীবনের মতো বেড়ে উঠছে বা উঠেছে। পক্ষান্তরে ‘শিকল বন্দি বানর জীবন’ কথাটা বেশ পুরানো তাই বর্তমানে এই কথাগুলির স্থলে আধুনিক ‘রিমোট কন্ট্রোল রোবট মানকি” এর কথাগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে। 
 
এবার বলবো এই গল্পের প্রভাব আমাদের সংসার জীবনে কিভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? উপরের শিকল বন্দি বানরের গল্প কিন্তু আমাদের সমাজে প্রায়শ: দেখতে পাবেন। সংসারে অনেক বাবারা কোনদিনও তার সন্তানের এই অধ:পতনের উৎস খুজে পায় না, কারন বাবারা মর্যাদাগতভাবে মানবিক ও মূল্যায়নের দিক দিয়ে অবমূল্যায়িত হওয়ায় তাদের স্ত্রীর উপর ১০০% নির্ভরশীল থাকে। ফলে সংসারের গোপন অনেক বিষয়ই শ্বশুরবাড়ীর লোকজন ছাড়া বাবাকে কখনোই লোভি ও আত্নকেন্দ্রিক মায়েরা তা বলে না বা এরুপ ঘটনা অস্বীকার করে। আর এভাবেই চলতে থাকে মূল্যবোধের অবক্ষয়। আর এভাবে ক্ষয়ে যাওয়া সংসার নাটক শেষ দৃশ্য অবধি চলতে থাকে, যতক্ষন না ছেলের নিজের নতুন বিবাহিত সংসারে আগুন লেগে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে ধ্বংস না হয়। মূর্খ, আত্নকেন্দ্রিক ও অপরিনামদর্শী মায়েদের লোভে কি পরিনাম ধ্বংস আর ক্ষতি হয় এইসব ছেলেদের জীবনে ও সংসারে, যা ভাষায় প্রকাশের কোন স্বস্তি থাকে না।
 
কাছে থেকে দেখা এরকম দু'টি পরিবারের কাহিনী বলবো আজ। 
 
 কিছুদিন আগের ঘটনা, ফ্যামিলিটি আমাদের বাড়ীতে ভাড়া থাকতো। ভদ্রলোকের পরিবার খুবই ধার্মিক প্রকৃতির। তার একটি বিবাহিত মেয়ে ও তার নাতনি নিজেদের সাথে বসবাস করতো। ঐ বিবাহিত মেয়েটি দেখতে খুব সুন্দরী ও শিক্ষিতা ছিল। কেউ বুঝতেই পারবে না এই বিবাহিত মেয়েটির দূর্বিসহ জীবনের গল্প কতটুকু কষ্টকর ।
 
অসমাপ্ত...লেখা শেষ হয়নি....... চলবে।
 
ফটো ক্রেডিট: ShutterStock, Google.

Wednesday, October 12, 2022

ট্রেনের নীচে আত্নহত্যা করা থেকে বেঁচে যাওয়া একটি মেয়ের সত্য ঘটনা।



    

এস,এম, নজরুল ইসলামের জীবন ঘনিষ্ট গল্প-কথা (০১)


 
 
 




ট্রেনের নীচে আত্নহত্যা করা থেকে বেঁচে যাওয়া একটি মেয়ের সত্য ঘটনা।

এই সমাজে মানুষের আত্নহত্যা প্রতিরোধে বেসরকারী পর্যায়ে গড়ে উঠেছে “সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশ” নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। আত্নহত্যা প্রতিরোধ করে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে এই সুইসাইড প্রোটেক্টিং স্কোয়াড বাংলাদেশ। আজ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি ২৭০ জন হতাশাগ্রস্থ মানুষকে আত্নহত্যার চিন্তা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে কারনে মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার মধ্যে আত্নহত্যা ১৩তম। 
 
গত ১১-১০-২০২২খ্রি: তারিখে দৈনিক আজকের প্রত্রিকায় প্রকাশিত আত্নহত্যা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আর্টিকেলটি পড়ার সময় আমার মনে পড়ে গেল, বিগত ২০১০ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমার জীবনে স্বাক্ষী হয়ে থাকা এমনি একটি ঘটনার স্মৃতি।এক বিকেলে ঢাকার খিলগাও রেলগেইটে ট্রেনের নীচে আত্নহত্যা করতে যাওয়া একজন গৃহবধূকে বাঁচানোর অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা।এতোদিন এই ঘটনাটি আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, আজ আবার মনে পড়ে গেল। তাই ফেসবুক/অন-লাইন বন্ধুদের জন্য ঘটনাটি লিখছি-
 
স্মৃতিতে যতটুকু মনে পড়ে, দিনটি ছিল বৃহসপতিবার, সেপ্টেম্বর, ২০১০ সন। সে সময় আমি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডা: কর্পোরেশনে চাকুরী করি। আমার কর্মস্থল ঢাকার দিলকুশাস্থ বিসিআইসি'র প্রধান কার্যালয়, বিসিআইসি ভবন থেকে ১ঘন্টা আগে শর্ট লীভ নিয়ে আগে বের হয়ে ৪.০০ টার দিকে আমি ও আমার বন্ধু শহীদুল ইসলাম (বর্তমানে মালয়েশিয়া প্রবাসি) ঢাকার ফকিরাপুল থেকে রিক্সাযোগে খিলগাও রেল গেটে আসি। প্রচন্ড রিক্সা জ্যাম থাকায় একটু পশ্চিমে থাকতেই আমারা শাহজাহানপুর অংশে নামলাম। যদিও আমাদের গন্তব্য ছিল খিলগাও তালতলা মার্কেট। ট্রেন যাচ্ছে বলে রেলগেইটের লেভেল ক্রসিংয়ের বার ফেলে রোড বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।সময় বাঁচানোর জন্য ভাবলাম, পায়ে হেটে ওপাশে গিয়ে আরেকটি রিক্সা ভাড়া নিয়ে গন্তব্যে যাব। কিন্তু পয়ে হেটে ক্রসিং বারের কাছে এলে লাইন ম্যান বললো, সাবধান ট্রেন এসে পরেছে তা্ই রেল লাইন পার হবেন না । ডানে তাকিয়ে দেখলাম কমলাপুর ষ্টেশন থেকে একটি ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে দ্রুত আসছে। অন্যান্যদের সাথে আমি ও আমার বন্ধু লেভেল ক্রসিংবার ঘেঁষে দাড়িয়ে গেলাম। হঠাৎ একজনের মৃদু ধাক্কায় পিছনে তাকালাম, দেখলাম কালো পাকিস্তানী বোরকা পরা একজন ম্লিম গড়নের মহিলা আমার গা ঘেষে নামাজের কাতারে দাড়ানোর মতো করে জোড় করে জায়গা নিয়ে দাড়ালো। কালো ওড়নাতে অর্ধেক মুখ ঢাকা ফর্সা মেয়েটি কাপছিল, আমি তার নি:শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। সে বারবার উকি মেরে সামনে ঝুকে ট্রেনের আগমন দেখছিল। আমি তাকে সাবধান করলাম আর সরে এসে পেছনে দাড়াতে বললাম। এরই মধ্যে ট্রেনটি চলে এসেছে কাছাকাছি। ঐ মেয়েটি আঁচমকা দুইবার সামনে ঝুকলো । চাপা জায়গায় বারবারই আমার শরীরের সাথে ঝাকি লাগছিল। আমি মেয়েটির অস্বাভাবিক আঁচরন ফলো করছিলাম। সে দ্রুতই ৩য় বার মাথা নীচু করে শরীর বাঁকিয়ে সামনে দিকে শরীরকে লাফ দেয়ার ভংগিমা করতেই আমার অবচেতন বুঝে গেল মেয়েটি আত্নহত্যার জন্য নিজেকে সমর্পন করতে যাচ্ছে। হঠাৎ করে আমার অবচেতন মনের নির্দেশে আমার ডান হাতটি স্বজোড়ে মেয়েটিকে তার ঘাড়ের কাপড়সহ চুলের মুঠি ধরে হেচকা টানে পিছন দিকে ফেলে দিলাম। আমি আজও ভাবতে পারি না আমি কিভাবে প্রবল শক্তি দিয়ে ঐ কাজটি করেছিলাম ? মূহুর্তেই এক্সপ্রেস ট্রেনটি ধূলোর বাতাস উড়িয়ে সাই করে চলে গেল। মেয়েটির বোরকার আচলটি ট্রেনের সাথে লেগে ফিরে এলো। পিছনে ধাক্কা লেগে আমরা দুজনেই মাটিতে বসে পড়লাম। তবে পাশে ও পিছনে আরও মানুষ দাড়ানো ছিল বলে তাদের সাথে বাধা পেয়ে আমরা পিছনে মাটিতে পরে যাইনি। সবাই ভেবেছিল, আমরা দু'জনে হয়তো ট্রেনের সাথে ধাক্কা খেয়েছি। আল্লাহ সত্যি মেহেরবান কারন এমনও হতে পারতো যে, সেদিন আমার মুষ্ঠিবদ্ধ শক্ত হাতের বাঁধনের চেয়ে যদি আত্নহত্যায় নিবেদিতা মেয়েটির ঝুকে পড়ার শক্তি বেশী হতো তবে হয়তো আমরা দু’জনই সেদিন একসাথে ট্রেনের নীচে কাটা পড়তাম এবং এক সাথেই আমরা মারা যেতাম।
 
আমরা বেঁচে গেলাম, অত:পর আমি প্রথমে মেয়েটিকে দু’হাতে ধরে উঠে দাড়াতে সাহায্য করালাম, তার মুখের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করলাম, মেয়েটি বয়স হবে হয়তো ২৫/২৬ বছর। আমি তাকে ঝাকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে ? কেন মরতে চেয়েছিলেন? তখন আমাদের চারিদিকে উপস্থিত মানুষের ভীষন জটলা বেধে গিয়েছে। উপস্থিত সবাই বুঝে গেল যে, মেয়েটি আত্নহত্যা করতে চেয়েছিল। ট্রেন চলে গেছে, লেভেল ক্রসিংয়ের বার উঠে গেছে। যানবাহন চলতে শুরু করেছে। সবাই বলাবলি করতে লাগলো ভাই মেয়েটি কি আপনার কেউ হয়? আমি বললাম, না তাকে আমি চিনি না, আমি পথচারী। আমাকে দিয়ে আল্লাহ তাকে বাচিয়েছে। সবাই বললো, ভাই আপনি মেয়েটিকে বাঁচিয়েছেন, আপনিই তাকে বাসায় পৌছে দিন। তা না হলে সে আবার ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিবে। আমি মেয়েটির খোলা মুখের দিকে তাকালাম, সে বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছে এবং উচ্চস্বরে অজোরে কাঁদছে আর বলছে, আমি মরতে পারলাম না, কেন বাঁচালেন আমাকে? আমি আমার ১(এক) বছরের ছোট মেয়েটিকে খালি বাসায় খাটের উপর বসিয়ে রেখে এসেছি। উপস্থিত লোকজন বলাবলি করতে লাগলো- মেয়েটি বিবাহিতা, হয়তো স্বামীর অত্যাচারে মরতে এসছিলো, কেউ বললো কষ্টের কারনে। কিন্তু আমি মেয়েটিকে কোন কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। মেয়েটিকে আমরা রেল ক্রসিং থেকে রেল লাইনের পূর্ব পাশে এনে শান্ত করলাম। তারপর শান্ত গলায় আমি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলাম, আপনার বাসা কোথায়? সে বললো, শাহজাহানপুর আমতলা থেকে ডান দিকের রাস্তা বরাবর একটু সামনে ডানের গলিতে। লোকজন আবার আমাকে বললো, ভাই আপনি বাঁচিয়েছেন তাই মহিলার সাথে আপনি যান আর তাকে তার স্বামীর জিম্মায় দিয়ে আসেন। আমার বন্ধু শহীদুল কিভাবে ঘটনাটি ঘটলো সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। হয়তো সে বিষয়টিতে কোন গূরুত্বই দিচ্ছিল না। আর সে আমাকে তাড়া দিচ্ছিল চলো তাড়াতাড়ি ঠিক সময়ে তালতলা মার্কেটে যেতে হবে। আমি বন্ধুর মুখের দিকে একবার তাকালাম। তারপর আমি মেয়েটিকে একটি রিক্সা ঠিক করে দিলাম। মেয়েটির শরীর কাঁপছিল তাই মেয়েটিকে রিক্সাতে বসতে হেল্প করলাম, রিক্সার হুট উঠিয়ে দিলাম এবং রিক্সাচালককে বললাম, ভাই এই নিন ভাড়া ২০/- টাকা তাকে যতনে শাহজাহানপুর আমতলার কাছে তার বাড়ীতে পৌছে দিবেন। আমার বন্ধু আমার হাত ধরে টানছিল তালতলাতে যাওয়ার রিক্সাতে উঠার জন্য আর আমি তাকিয়ে ছিলাম রেলগেইট পেরিয়ে মেয়েটি চলে যাওয়ার রিক্সাটির দিকে।
 
আজ এতোদিন পরে রেলগেইটের লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের নীচে পড়ে আত্নহত্যায় চেষ্টা করা মেয়েটির কথা খুব মনে পড়ছে। জানি না, ঐ মেয়েটি কি দ্বিতীয় বার আত্নহত্যা করতে চেয়েছিল কিনা ? যদি গৃহবধূটি আজও বেঁচে থাকে তবে হয়তো তার ছোট্ট মেয়েটির বয়স হবে ১৪ (চৌদ্দ বছর)। 
 
আত্নহত্যা করতে যাওয়া মেয়েটিকে বাঁচাতে সেদিনের আমার অবচেতন মনের ঐ ছোট্ট প্রচেষ্টার কথা ভাবতে খুব ভাল লাগে। আমি মেয়েটির নাম জানি না। আমার কাছে মেয়েটির কোন ঠিকানা জানা নেই। মেয়েটিকে আমি ভাল করে জানতে পারিনি তাই আমার স্মৃতিতে মেয়েটি দূর থেকে দূরে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। জানি না, সে ইন্টারনেট বা টাচ মোবাইল ফোন অপারেট করতে জানে কিনা ? আজকাল ফেসবুকে তো অনেক হারানো মানুুষকে খুজে পাওয়া যায়। মেয়েটির অশ্রুসজল আবছা চেহারাটি আমার ঠিক মনে নেই। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে খিলগাও রেলগেইটে ট্রেনের নীচে আত্নহত্যা করতে যাওয়া ভালবাসা বঞ্চিত সেই য়েটি আজও বেঁচে আছে কিনা ? নাকি সে আবার 
আত্নহত্যা  করেছে ?

 
লেখক: এস, এম, নজরুল ইসলাম।
ই-মেইল: recentbd@gmail.com

মেবা্বাইল: +৮৮০১৬৭৩২৬৮৪৪৬

https://fb.watch/gTuluvMo_n/

 

আত্নহত্যা করতে যাওয়া ভালবাসা বঞ্চিত মেয়েদের বেচে যাওয়ার পরবর্তী জীবনের গল্প উপরের ভিডিওটির মতো হলে সত্যি তা সুন্দর হতো...................



এপোলো-১১ মিশনে অংশ নেয়া চাঁদের মাটিতে ঘুরে আসা লাল মানুষ দেখার শৈশব স্মৃতি।

এপোলো-১১ মিশনে অংশ নেয়া চাঁদের মাটিতে ঘুরে আসা লাল মানুষ দেখার শৈশব স্মৃতি। আমার শৈশবের কথা বলতে গেলে আমি প্রায়ই নস্টালজিয়াতে ভোগি। আজকে আ...